হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
ভূমিকা
মহান আল্লাহ সৃষ্টিজগতে ‘হাকিকতে মুহাম্মদিয়া’র চেয়ে উচ্চতর কোনো সত্তা ও শ্রেষ্ঠ কোনো সত্য সৃষ্টি করেননি। ইসলাম ধর্মের মহানবী (সা.) সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর অস্তিত্বের সূর্য সমগ্র দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতকে উষ্ণতা ও আলোয় উদ্ভাসিত করে। তাঁর অস্তিত্বের ‘রহমত’ এতই সর্বব্যাপী যে, তাঁর ‘রিসালাত’ শুধু সর্বশেষ নবীর রিসালাত নয়, বরং সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রিসালাত। সৃষ্টিজগতের মধ্যে একমাত্র তিনিই এমন ব্যাপক পরিসরে আল্লাহর রহমানিয়াতের প্রকাশ:
আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি। [১]
আল্লাহর রহমতের নবী, যিনি ঐশী নবুওয়তের ইতিহাসের এই পর্যায়ে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি নবীদের অগ্রপথিক ও তাঁদের ধারার সূচনাকারী ও পরিসমাপ্তিকারী। এই ধারার উভয় প্রান্তই তাঁর মধ্যে এসে মিলিত হয়েছে এবং তাওহিদের দাওয়াতের শুরু ও শেষ-সবই তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আল্লাহর নবীগণ তাঁদের সমস্ত মহিমা সত্ত্বেও এই ধারার একেকটি কড়ি মাত্র। আর নবী (সা.)-এর জন্মের সূর্যের আলোয় সব যুগ ও সব নবী অবস্থান করছেন; এমনকি ইবরাহিম খলিলুল্লাহ (আ.)-ও, যাঁর প্রতি মহানবী (সা.) বিশেষ শ্রদ্ধা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন।
যেমন তিনি বলেছেন: আমাদের প্রথমজন মুহাম্মদ, আমাদের মধ্যবর্তীজন মুহাম্মদ, আমাদের শেষজন মুহাম্মদ এবং আমরা সবাই মুহাম্মদ। [২]
আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক তাঁদের ওপর, যাঁরা সবাই ‘মুহাম্মদ’; এবং তাঁদের ওপরও, যারা সত্যনিষ্ঠভাবে মুহাম্মদী পথ ও আদর্শের অনুসরণ করেন।
মহানবী (সা.): সৃষ্টির নির্যাস ও সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম
এখানে আলোচনা হচ্ছে সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে সুন্দর, পূর্ণতম ও শ্রেষ্ঠ মানব সম্পর্কে-এমন একজন, যিনি সৃষ্টির নির্যাস এবং সকল মহৎ মূল্যবোধের প্রতীক। তিনি সকল নবীর গুণাবলি ও শ্রেষ্ঠত্বের উত্তরাধিকারী। পরিপূর্ণ বিনয়, চূড়ান্ত নম্রতা এবং ইবাদতের সর্বোচ্চ স্তর তাঁর অস্তিত্বে প্রকাশিত হয়েছে। তিনিই সেই ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, যাঁকে আল্লাহ জ্ঞান ও ইবাদতের বিনিময়ে সমগ্র বিশ্বের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এমন এক মর্যাদার সান্নিধ্যে নিয়ে গেছেন, যার ওপারে আমিন জিবরাইলেরও অগ্রসর হওয়ার ক্ষমতা ছিল না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ‘ইনসানে কামিল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানব হিসেবেই নন, বরং সৃষ্টির ‘প্রথম নূর’ হিসেবেও এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী। বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম নবী (সা.)-এর নূর সৃষ্টি করেন এবং তাঁর অস্তিত্বের বরকতেই সমগ্র সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব লাভ করে। এ কারণে নবী (সা.)-কে সৃষ্টির ‘চূড়ান্ত উদ্দেশ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর জন্য এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি আল্লাহর নাম ও গুণাবলির পূর্ণতম প্রকাশ হয়ে ওঠেন।
নবী (সা.)-এর জন্ম এবং ফেরেশতাদের অভিনন্দনবেষ্টিত আমেনা
রাত, নিঃসঙ্গতা, নীরবতা এবং আবদুল্লাহকে হারানোর হৃদয়বিদারক বেদনা আমেনার হৃদয়কে কষ্ট দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ তিনি নীরবে নিজের দুঃখে কাঁদলেন এবং অশ্রুবিন্দু দিয়ে তাঁর আহত হৃদয়কে সান্ত্বনা দিলেন। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন, তাঁর অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। নিজের মধ্যে একটি নড়াচড়া অনুভব করে বুঝতে পারলেন যে, প্রতীক্ষিত সময় এসে গেছে। তিনি উঠে অন্যদের সংবাদ দিতে চাইলেন, যাতে তাঁরা এসে তাঁকে সাহায্য করতে পারেন; কিন্তু মনে হলো তাঁর কোনো শক্তি নেই। তখন তিনি অন্তর থেকে আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি করে দোয়া করলেন।
এমন সময় কক্ষটি তীব্র আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। ঘরের ছাদ বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং আকাশ থেকে চারজন নূরানী নারী অবতরণ করলেন। তাঁদের দেহ ছিল বসন্তের সরু ও সুঠাম গাছের মতো, পরনে ছিল সাদা পোশাক এবং তাঁদের মুখমণ্ডল ছিল আলোয় পরিপূর্ণ। তাঁরা এত সুগন্ধময় ছিলেন যে, আমেনা তাঁদের মনোমুগ্ধকর সুবাস অনুভব করতে পারছিলেন। তাঁদের হাতে ছিল পান্না ও মুক্তাখচিত পাত্র, যার মধ্যে ছিল সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত শরবত।
নারীরা তাঁর পাশে বসে তাঁকে সেই শরবত পান করালেন। কয়েক ঢোক পান করার পর তাঁর অন্তর থেকে ভয় ও আতঙ্ক দূর হয়ে গেল এবং তাঁর হৃদয় নূর ও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। এরপর ফেরেশতারাও অবতরণ করলেন এবং তাঁদের তাসবিহ ও তাহলিলের মৃদু ধ্বনিতে ঘরটি মুখরিত হয়ে উঠল। আবার এক নতুন আলো কক্ষটিকে আচ্ছন্ন করল। এবার আমেনার বাসভবনে কিছু পাখি সমবেত হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক প্রিয় নবজাতক পৃথিবীর আলো দেখলেন। এভাবেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সপ্তদশ রবিউল আউয়ালের ভোরে সন্তানকে দেখে আমেনা আনন্দিত হলেন এবং তাঁর মুখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ভূমিতে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কাবার দিকে মুখ করে সিজদায় অবনত হলেন। তাঁর পবিত্র অস্তিত্ব থেকে এমন এক নূর বিচ্ছুরিত হলো, যা চারদিক আলোকিত করে দিল। ফেরেশতাদের আনন্দধ্বনি শোনা গেল। শিশুটির ছোট্ট অধর মহান ও দয়াময় প্রতিপালকের জিকিরে মুখরিত হলো এবং তিনি আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্য দিলেন। ফেরেশতারা অভিনন্দন ও বরকতের উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে এগিয়ে এলেন, শিশুটিকে স্নেহ করলেন এবং তাঁর আগমনকে সম্মান ও বরকতময় বলে অভিহিত করলেন।
মহানবী (সা.)-এর জন্ম এবং বিস্ময়কর ঘটনাবলি
মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কারপূর্ণ রীতিনীতি ও মানুষের ওপর প্রতিষ্ঠিত জুলুমপূর্ণ সম্পর্কের অবসানের জন্য যেন সতর্কবার্তার ঘণ্টা বেজে উঠল। আনুশিরওয়ানের প্রাসাদ, যা মানুষের মনে চিরস্থায়ী ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, কেঁপে উঠল এবং তার চৌদ্দটি কংগ্রা ভেঙে পড়ল। পারস্যের অগ্নিমন্দিরের হাজার বছরের প্রজ্বলিত আগুন হঠাৎ নিভে গেল। সমস্ত মূর্তি উপুড় হয়ে পড়ল এবং সাওয়া হ্রদ শুকিয়ে গেল।[৩]
মহানবী (সা.)-এর পবিত্র অস্তিত্ব থেকে একটি নূর আকাশের দিকে উঠে বহুদূর পর্যন্ত আলোকিত করে দিল। আনুশিরওয়ান ও মুবাদরা ভয়ংকর সব স্বপ্ন দেখলেন। একই সময়ে ইয়াসরিবের এক ইহুদি একটি দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, এটি আহমদের নক্ষত্র! আর এক লম্বা দেহের, সাদা দাড়িওয়ালা বেদুইন আরব মক্কায় এসে এ কথাগুলো ফিসফিস করে বলল: গত রাতে মক্কা ঘুমিয়ে ছিল এবং আকাশে কী আলোর ঝলকানি ও নক্ষত্রের বৃষ্টি ঘটেছে, তা সে দেখতে পায়নি; মনে হচ্ছিল, নক্ষত্রগুলো যেন তাদের স্থান থেকে ছিঁড়ে পড়েছে এবং চাঁদ নিচে নেমে এসেছে। [৪]
এসব ঘটনা ছিল মহানবী (সা.)-এর জন্মের সঙ্গে বিশ্বজগতে সংঘটিত এক মহাবিপ্লবের প্রতীক। জুলুম ও অত্যাচারের প্রাসাদ হেদায়াতের নূরের সামনে ধসে পড়ছিল এবং শিরক ও কুফরের অগ্নিমন্দিরগুলো নিভে যাচ্ছিল। এসব নিদর্শন ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদ-অন্ধকারের যুগের অবসান ঘটেছে এবং হেদায়াতের সূর্যোদয় ঘটেছে।
এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ
এই সময় আমেনা সদ্য আগত শিশুটিকে অপরিসীম ভালোবাসায় নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন। এমন সময় এক অদৃশ্য আহ্বানকারী ঘোষণা করলেন: হে আমেনা! আমি এই শিশুকে প্রত্যেক হিংসুক ও বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি; আর এই গোপন বিষয় কারও সঙ্গে আলোচনা করো না।
আমেনা নিচু স্বরে সেই দোয়াটি পুনরাবৃত্তি করলেন এবং ডান হাতের কোমল স্পর্শে সন্তানের কপাল ও দুই ভ্রুর মধ্যবর্তী স্থান স্নেহভরে স্পর্শ করলেন।
এই আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের ঘটনা নির্দেশ করে যে, নবী (সা.) জন্মের মুহূর্ত থেকেই আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষার অধীনে ছিলেন এবং কোনো শক্তিই তাঁকে ক্ষতি করতে পারত না। একই সঙ্গে এই ঘটনা প্রকাশ করে যে, নবী (সা.)-এর জন্ম কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যার সঙ্গে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ জড়িত ছিল।
উপসংহার
মহানবী (সা.)-এর জন্ম মানবজাতির ইতিহাসে এক মহান বিপ্লবের সূচনালগ্ন। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং এমন এক সূর্যের উদয়, যিনি তাঁর নূর দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করেছেন। সৃষ্টির নির্যাস ও সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে নবী (সা.) আল্লাহর রহমতের প্রকাশ এবং পূর্ণতম মানব। তাঁর জন্মের সঙ্গে সংঘটিত বিস্ময়কর ঘটনাবলি ছিল এক মহাবিপ্লব এবং জাহেলিয়াতের যুগের অবসানের নিদর্শন।
অতএব, মহানবী (সা.)-এর জন্ম সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর সঙ্গে নতুন করে অঙ্গীকার নবায়ন এবং তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
[১] সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ১০৭।
[২] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৫, পৃ. ৩৬৩।
[৩] তারিখে ইয়াকুবি, খণ্ড ২, পৃ. ৫৫।
[৪] ইবনে শাহর আশুব, আল-মানাকিব, খণ্ড ১, পৃ. ৩০।
মজিদুল ইসলাম শাহ
আপনার কমেন্ট